সুজন কুমার তঞ্চঙ্গ্যা :
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার দুর্গম বড়থলি ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত হয়নি কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্থানীয় উদ্যোগে গড়ে ওঠা কয়েকটি বেসরকারি বিদ্যালয়ই সেখানে শিশুদের শিক্ষার একমাত্র ভরসা। তবে সরকারি সহায়তা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণের অভাবে এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকরা। এমনকি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করতে হচ্ছে পুরোনো বই দিয়ে।
বড়থলি ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত রাইমংছড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে চারজন শিক্ষক ও ৫৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে কোনো ধরনের নিয়মিত সরকারি সহযোগিতা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অন্তর বাবু তঞ্চঙ্গ্যা।
তিনি জানান, ফারুয়া ইউনিয়ন থেকে পায়ে হেঁটে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে প্রায় দুই দিন সময় লাগে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়। সবচেয়ে বড় সংকট নিয়মিত সরকারি পাঠ্যবই না পাওয়া। ফলে পুরোনো বই সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চালিয়ে নিতে হচ্ছে। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষকরা নিজেদের আন্তরিকতা ও শ্রম দিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম ধরে রেখেছেন। বিদ্যালয়টির ইএমআইএস (EMIS) কোড ০০৪১৪১০০৩২২। স্থানীয় নির্বাচনেও বিদ্যালয়টি ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বড়থলি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বীর লাল ত্রিপুরা জানান, শিক্ষা সংকটের পাশাপাশি ইউনিয়নটির সঙ্গে উপজেলা সদরের কোনো সুগম যোগাযোগব্যবস্থা নেই। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কের সুবিধাও অনুপস্থিত। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে শিক্ষার্থীরা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি এবং সরকারি-বেসরকারি চাকরির নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য যথাসময়ে জানতে পারে না। এতে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকেও তারা পিছিয়ে পড়ছে।
বড়থলি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জামাইয়া তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে পুরো ইউনিয়নে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কিংবা স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অধিকাংশ পরিবারের আর্থিক অবস্থা দুর্বল এবং জুমচাষই তাদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। ফলে দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে।
তিনি জানান, ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে স্থানীয় উদ্যোগে কয়েকটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো সরকারিকরণের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের মাধ্যমে চারটি বিদ্যালয়ের তালিকা উপজেলা শিক্ষা অফিসে জমা দেওয়া হয়েছিল। বিদ্যালয়গুলো হলো—রাইমংছড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, টাইগারপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড়থলি ত্রিপুরাপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং প্রংজাংপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
চেয়ারম্যান আরও বলেন, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ইউনিয়নে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইউনিয়নের একমাত্র জুনিয়র হাইস্কুলটিও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে চলছে। রাইমংছড়া বিদ্যালয় কিছুটা সহযোগিতা পেলেও অন্য বিদ্যালয়গুলো এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা থেকে বঞ্চিত। দুর্গম এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ কামনা করেন তিনি।
এ বিষয়ে বিলাইছড়ি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নিরালা কান্তি চাকমা বলেন, বড়থলি ইউনিয়নের রাইমংছড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটি জাতীয় ও উপজেলা নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে বিদ্যালয়টির ভৌত অবকাঠামো অত্যন্ত নাজুক। সেখানে কর্মরত শিক্ষকরা অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা ছাড়াই আন্তরিকতার সঙ্গে শিশুদের পাঠদান করে যাচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকারি পাঠ্যবই সরবরাহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। আইপিইএমআইএস (IPEMIS) পোর্টালে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এপিএসএস (APSS) তথ্য পূরণ করে বইয়ের চাহিদা পাঠাতে হয়। কিন্তু বিদ্যালয়টি দুর্গম ও নেটওয়ার্কবিহীন এলাকায় হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও চাহিদা পাঠাতে সমস্যা হতে পারে। এ কারণে বই পাওয়ার প্রক্রিয়াও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী পাঠদানের অনুমতি না নেওয়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি সুযোগ-সুবিধা পায় না। বিদ্যালয়টি প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও শর্ত পূরণ করে সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় এলে এলাকার শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে।
অন্যদিকে, বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অভি দাশ জানান, বড়থলি ইউনিয়ন অত্যন্ত দুর্গম ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হওয়ায় সেখানে শিক্ষা উপকরণ পৌঁছে দিতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে কোনো শিক্ষার্থীকে শিক্ষা উপকরণ থেকে বঞ্চিত করা হবে না। ইউনিয়নের টাইগারপাড়ায় গিয়ে শিক্ষা উপকরণ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে দুজন করে শিক্ষার্থী, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে এসব উপকরণ বিতরণ করা হবে। রাইমংছড়া বিদ্যালয়সহ ইউনিয়নের অন্যান্য বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষার্থীসংখ্যার তালিকা উপজেলা প্রশাসনে জমা দিতে হবে। তালিকা পাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী বই ও শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্গম বড়থলি ইউনিয়নের শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে রাইমংছড়াসহ অন্যান্য বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকদের আর্থিক সহায়তা, নিয়মিত পাঠ্যবই সরবরাহ এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কের সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পথও সহজ হবে।
