ইউসুফ আদনান :
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল দিন। এদিন সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। লেখকের দৃষ্টিতে, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে শুধু একজন সেনাপ্রধানকে মুক্ত করা হয়নি, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথও নতুনভাবে উন্মুক্ত হয়েছিল।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল শোষণ ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। লেখকের মতে, স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার এসব প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়। সমাজের বিভিন্ন স্তরে বৈষম্য, অন্যায় ও অবিচার বৃদ্ধি পায়। সুশাসনের অভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দুর্নীতির বিস্তার ঘটে। একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা বন্ধ হতে থাকে, বাড়তে থাকে বেকারত্ব। সাধারণ মানুষের জন্য দুবেলা খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে অনাহারে বহু মানুষের মৃত্যু হয়।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং অল্প কয়েকটি পত্রিকা ছাড়া অধিকাংশ সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি রক্ষীবাহিনী নামে একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করা হয়। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, এ বাহিনীর মাধ্যমে ভিন্নমত দমন ও সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।
এরই মধ্যে ১৫ আগস্টের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। তাঁর শাসনামলেও দেশে রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকে। এ সময় সেনাবাহিনীর একটি অংশ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ক্ষমতার পালাবদলের উদ্যোগ নেয়। ৫ নভেম্বর সেনানিবাসে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। খন্দকার মোশতাককে পদত্যাগে বাধ্য করে খালেদ মোশাররফ নিজেকে সেনাপ্রধান ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। আগে থেকেই রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতায় ক্ষুব্ধ জনগণের একটি অংশও সেনাসদস্যদের সঙ্গে যুক্ত হয়। সততা, সাহস ও নেতৃত্বের গুণাবলির কারণে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর একটি অংশের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছেও তিনি পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন।
৭ নভেম্বর ভোর থেকে সেনাবাহিনীর একাংশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন পক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের একটি অংশও এতে যুক্ত হয়। সেনাসদস্য ও জনতার এই সম্মিলিত অভ্যুত্থানের মুখে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। একপর্যায়ে জিয়াউর রহমান মুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে সংঘটিত সহিংসতায় কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন।
এই ঘটনাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল হিসেবে বিবেচনা করেন লেখক। এর পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন জিয়াউর রহমান। প্রথমে তিনি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। পরে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনামলে খাল খনন কর্মসূচি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ, কৃষকদের জন্য সহায়তা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মতো কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন এবং ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়নও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
লেখকের মতে, সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা সামনে রেখে জিয়াউর রহমান সাধারণ মানুষের কাছে ‘জনতার জিয়া’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
