
উপ-সম্পাদকীয়:
১৯৯০ সালের ১৬ এপ্রিল, বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যাছড়ি এলাকায় সংঘটিত একটি সহিংস ঘটনা আজও পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে গভীরভাবে আলোচিত ও বিতর্কিত। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বিভিন্ন বিবরণ ও অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিনে বহু বাঙালি বাসিন্দা নিহত হন, অনেকে গুরুতরভাবে আহত হন এবং আরও অনেকে নিখোঁজ হয়ে যান। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত আক্রমণ, যেখানে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তবে এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ, রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ না হওয়ায় ঘটনাটির অনেক দিকই অনিশ্চয়তা ও বিতর্কের মধ্যে রয়ে গেছে।
এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বারবার উঠে এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি-এর নাম, যার সশস্ত্র শাখা হিসেবে পরিচিত ছিল শান্তি বাহিনী। একইসঙ্গে সংগঠনটির শীর্ষ নেতা হিসেবে পরিচিত সন্তু লারমা-কেও বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই অভিযোগগুলোর বিচারিক যাচাই বা আদালতে প্রমাণিত কোনো চূড়ান্ত রায় আজও সামনে আসেনি। ফলে একদিকে যেমন ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ রয়েছে, অন্যদিকে আইনি প্রক্রিয়ার অভাব এই ঘটনাকে একটি অমীমাংসিত অধ্যায়ে পরিণত করেছে।
নাইক্ষ্যাছড়ির এই সহিংসতার বর্ণনায় যে চিত্র উঠে আসে, তা নিছক একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক অস্থিরতা, সংঘাত ও সশস্ত্র রাজনীতির প্রতিফলন। সেই সময় অঞ্চলটিতে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, নিরাপত্তাহীনতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস চরম আকার ধারণ করে। বেসামরিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ, প্রায়ই এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে ওঠে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এত গুরুতর একটি ঘটনার পরও কেন রাষ্ট্র একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি? কেন নিহত ও নিখোঁজদের পরিবারগুলো আজও বিচার পায়নি? এটি কি শুধুই প্রশাসনিক দুর্বলতা, নাকি এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক সমঝোতা, কৌশলগত নীরবতা, কিংবা বৃহত্তর শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কিছু বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত?
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র অনেক সময় একটি জটিল সমীকরণের মধ্যে পড়ে একদিকে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে অতীতের সহিংস ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি এই অঞ্চলে সংঘাত কমাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হলেও, এর ফলে অনেক পুরোনো অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়া কার্যত স্থগিত বা উপেক্ষিত হয়ে গেছে এমন অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন মহলে।
এই বাস্তবতায় নাইক্ষ্যাছড়ির ঘটনার মতো বিষয়গুলো এক ধরনের “বিচারহীনতার সংস্কৃতি” তৈরি করেছে। যখন কোনো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হয় না, দায়ীদের শনাক্ত করা হয় না এবং বিচার নিশ্চিত হয় না তখন তা শুধু একটি ঘটনার ক্ষতই রেখে যায় না, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এতে করে অপরাধীরা পরোক্ষভাবে উৎসাহিত হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমে যায়।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও গভীর। তাদের জন্য এটি শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয় বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা। তারা তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছে, কেউ এখনো নিখোঁজ, কারও কবরও নেই। এই শোকের সাথে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ প্রতীক্ষা একটি ন্যায্য বিচারের জন্য, একটি স্বীকৃতির জন্য, একটি সত্য উদঘাটনের জন্য।
রাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা থাকে সে তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করবে। কিন্তু নাইক্ষ্যাছড়ির মতো ঘটনায় দীর্ঘ নীরবতা ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা উভয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত একটি বহুমাত্রিক সমস্যা যেখানে ইতিহাস, রাজনীতি, জাতিগত পরিচয়, ভূমির অধিকার এবং নিরাপত্তা সবকিছু জড়িত। তাই কোনো একটি ঘটনার বিচার করতে গেলে পুরো প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিতে হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো উপেক্ষা করা হবে।
আজকের প্রজন্মের কাছে নাইক্ষ্যাছড়ির ঘটনা অনেকটাই অজানা বা অস্পষ্ট। কারণ এটি নিয়ে খুব কম গবেষণা, প্রকাশনা বা সরকারি দলিল পাওয়া যায়। ফলে সত্য উদঘাটনের পরিবর্তে নানা বর্ণনা, মতামত ও রাজনৈতিক অবস্থানের উপর নির্ভর করেই এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা হয়। এটি একটি বিপজ্জনক প্রবণতা, কারণ এতে ইতিহাস বিকৃত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন, যেখানে অতীতের এই ধরনের ঘটনাগুলো পুনর্বিবেচনা করা হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার এবং দলিলপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সত্য তুলে ধরা সম্ভব। একইসঙ্গে ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং মানসিক সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয় এটি একটি নীতিগত অবস্থান। যে-ই অপরাধ করুক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এই নীতি প্রতিষ্ঠা না হলে সমাজে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
নাইক্ষ্যাছড়ির সেই দিনের ঘটনা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে আমরা কি সত্যের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত? আমরা কি অতীতের ভুল স্বীকার করে ন্যায়বিচারের পথে এগোতে পারব? নাকি রাজনৈতিক সুবিধা ও কৌশলগত কারণে আমরা এই ধরনের ঘটনাগুলোকে চিরতরে অন্ধকারে ঢেকে রাখব?
যদি সত্যিই একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে চাই, তাহলে নাইক্ষ্যাছড়ির মতো ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এটি শুধু ভুক্তভোগীদের প্রতি দায়িত্ব নয় এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় নৈতিকতারও একটি পরীক্ষা।
নাইক্ষ্যাছড়ি আজ শুধু একটি স্থান নয় এটি একটি প্রতীক। বিচারহীনতার প্রতীক, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক এবং একইসঙ্গে ন্যায়বিচারের অমলিন দাবির প্রতীক। যতদিন না এই দাবির যথাযথ প্রতিফলন ঘটে, ততদিন এই অধ্যায় আমাদের জাতীয় বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই থাকবে।
একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সে জন্য নিরাপত্তা জোরদার ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা জরুরী।
আপনার মতামত লিখুন :