টানা বৃষ্টিতে গুইমারায় অসময়ের শিম চাষে বিপর্যয় কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা

খাগড়াছড়ি কৃষি গুইমারা

প্রতিনিধি:খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে গ্রীষ্মকালীন বা অসময়ের শিম চাষে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ছত্রাকজনিত রোগ, গাছের পচন এবং ফুল-ফল ঝরে পড়ায় কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এতে লাভের আশা করা কৃষকরা এখন পুঁজি ফেরত পাওয়া নিয়েই উদ্বিগ্ন।

কয়েক বছর ধরে গুইমারার পাহাড়ি টিলা ও ঢালু জমিতে গ্রীষ্মকালীন শিম চাষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শীতকাল ছাড়া দেশের বাজারে শিমের সরবরাহ কম থাকায় এ অঞ্চলের উৎপাদিত শিমের চাহিদা ও দাম ছিল বেশ ভালো। মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি শিম ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার হাফছড়ি ইউনিয়নের বড়পিলাকসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩৮ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন শিমের আবাদ হয়েছে। তবে কয়েক সপ্তাহের টানা বর্ষণে অধিকাংশ ক্ষেতেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা যাচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক শিমগাছের পাতা ও কাণ্ডে পচন ধরেছে। গাছ লালচে বর্ণ ধারণ করছে এবং ফুল ও কচি শিম ঝরে পড়ছে। কোথাও কোথাও পুরো গাছই মারা যাচ্ছে। এতে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বড়পিলাক এলাকার কৃষক মো. সাদ্দাম হোসেন জানান, পাঁচ বিঘা জমিতে শিমের আবাদ করেছিলেন তিনি। ফলন ভালো হলেও টানা বৃষ্টিতে গাছ নষ্ট হয়ে প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন লাভ নয়, বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়েই শঙ্কায় রয়েছেন।

স্থানীয় কৃষক ও জনপ্রতিনিধি মো. ছানা উল্লাহ মেম্বার বলেন, দুই একর জমির অধিকাংশ শিমক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে তার প্রায় চার লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং প্রতিদিন ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।

আরেক কৃষক মো. নুরুল ইসলাম নুরু জানান, শিম বিক্রির অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ফসল নষ্ট হওয়ায় এখন কিস্তির টাকা পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, প্রতি বিঘা জমিতে বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি এবং মাচা তৈরিসহ প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে ফলন সংগ্রহের পরিকল্পনা থাকলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগে তা ভেস্তে গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, ফসলহানির পরও বিভিন্ন ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের কিস্তির চাপ অব্যাহত রয়েছে। এতে তারা আর্থিক সংকটের পাশাপাশি মানসিক চাপের মধ্যেও রয়েছেন। তাদের দাবি, দুর্যোগকালীন সময়ে অন্তত তিন মাসের জন্য ঋণের কিস্তি স্থগিত করা হোক।

গুইমারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, টানা অতিবৃষ্টির কারণে অনেক শিমচাষি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। মাঠ পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন এবং ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করে তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে, যা উপজেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হবে। তবে শুধুমাত্র শিমচাষিদের জন্য পৃথক কোনো প্রণোদনার সুযোগ বর্তমানে নেই বলেও তিনি জানান।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় গ্রীষ্মকালীন শিম চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনা ধরে রাখতে উন্নত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, রোগ প্রতিরোধী জাতের উদ্ভাবন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় কৃষকদের এই লাভজনক ফসল চাষে আগ্রহ কমে যেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *