মো. বেলায়েত হোসেন :
ইউনেস্কো নির্ধারিত ‘Upholding Information Integrity in the Digital Age: The role of access to information in addressing Information Disorder’ বাংলায়- ‘ডিজিটাল যুগে সঠিক তথ্য নিশ্চিতকরণ: অপতথ্য রোধে তথ্য অধিকারের ভূমিক’ প্রতিপাদ্যে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস পালিত হচ্ছে। ডিজিটাল যুগে সঠিক তথ্য নিশ্চিতকরণের বিষয়টি প্রতিপাদ্যে অন্তর্ভুক্তি একটি বিশেষ ইঙ্গিত বহন করে এবং এটি সময়োপযোগি। সঠিক তথ্যের বিপরীতে ভুলতথ্য (Misinformation), অপতথ্য (Disinformation) এবং ক্ষতিকর তথ্য (Malinformation) তথা গুজবের একটি শক্তিশালী অবস্থানের বিষয়টি নিখাদ সত্য। আর ডিজিটাল যুগে ব্যবহৃত বিভিন্ন টুলস বিশেষ করে এআই ব্যবহারে সেই গুজবকে কয়েক’শ গুণে আমাদের হাজির হয়। ডিজিটাল টুলস- এআই মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে সহজ ও গতিশীল করার ক্ষেত্রে আশীর্বাদরূপে উপস্থাপিত হওয়ার কথা থাকলেও এর অপব্যবহারের কারনে বর্তমানে কিছ কিছু ক্ষেত্রে অভিশাপের ভূমিকায় অবর্তীণ হয়েছে।
তথ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইন- ২০০৯ এবং ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হতে প্রাপ্ত তথ্যের ধরনে ভিন্নতা রয়েছে। তথ্য অধিকার আইনে একটি প্রক্রিয়ার অবলম্বনে তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে ডিজিটাল মাধ্যমে এআই ব্যবহার পূর্বক তথ্য সমূহ কন্টেন্ট আকারে সামাজিক যোগাযোগ মাদ্যমে ইচ্ছা- অনিচ্ছায় সামনে এসে হাজির হয়। এটিই হচ্ছে সবচেয়ে উদ্বেগ এবং বিপদজনক বিষয়ক। ডিজিটাল টুলস কেন্দ্রিক কন্টেন্ট ক্রিয়েটর নামক এক ধরনের পেশা বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। এক্ষেত্রে কন্টেন্ট তৈরীতে যেসব তথ্য ব্যবহার করা হয়, তাতে সত্যতার চেয়ে বিকৃত কিংবা মিথ্যা তথ্যের প্রাধান্য বেশি। সবচেয়ে বেশি ভিউ এবং টাকা উপার্জনের বিষয়টি জড়িত থাকায় বস্তুনিষ্ঠতা এবং নৈতিকতার বিষয়টি অনেকটা উপেক্ষিত। এর সাথে এআই টুলস ব্যবহার করে ভুল তথ্য দিয়ে আকর্ষণীয় ভিডিও কন্টেন্ট তৈরী করায় সাধারণ মানুষ আগ্রহ সহকারে দেখে এবং বিশ্বাস করে। এতে মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিব্রত, দিকভ্রষ্ট এবং উত্তেজিত হওয়ায় সামাজিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলায় ব্যাপকভাবে ব্যহত হয়। এ প্রেক্ষাপট শুধু যে বাংলাদেশে তা নয়। উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে নাগরিকের শিক্ষা, দক্ষতা এবং সচেতনতার কারনে এ ধরনের গুজব সংখ্যায় হয়তো কম কিন্তু অনুন্নত রাষ্টগুলোর উন্নয়ন, অগ্রগতি, নিরাপত্তা, শৃংখলা এবং স্থিতিশীলতা ব্যাপকভাবে ব্যহত হচ্ছে।
বর্তমান যুগে ডিজিটাল মাধ্যমে সঠিক তথ্য প্রবাহে একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এআই ব্যবহার করে কন্টেন্ট তৈরীর বিষয়টি অনেকটা বিপদজনক বলতে হয়। ডিজিটাল ডিভাইস এআই ব্যবহারের পূর্বে ডিজিটাল লিটারেসি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেখানে দেশের প্রায় ৩০ ভাগ মানুষ এখনো শিক্ষার আলো থেকে অন্ধকারে রয়েছে, সেখানে তাদের কাছ থেকে ডিজিটাল লিটারেসি প্রত্যাশা অমাবস্যার চাঁদের মতো। আবার যারা শিক্ষিত তাদের অনেকের মধ্যেও ডিজিটাল লিটারেসি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান বরাবরই অনুপস্থিত। অথচ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) সূত্র মতে, আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজার। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন- ফেসবুক, টুইটার, ম্যাসেঞ্জার, ইনস্ট্রাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ কোটি। ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য প্রবাহের অধিকাংশই এসব মাধ্যমে হচ্ছে।
তথ্য অধিকার আইনের একটি অনন্য দিক হচ্ছে- সকল আইন যেখানে জনগণের উপর আরোপিত হয়, সেখানে এটি আরোপিত হয় কর্তৃপক্ষের উপর। আর কর্তৃপক্ষ বলতে- সংবিধান, সরকারের আইন, বিধি- বিধান দ্বারা নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান এবং সরকারী সাহায্যপুষ্ট বিদেশী সংস্থাকে বুঝানো হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে সকল নাগরিক তথ্য সেবা প্রাপ্তির অধিকার রয়েছে। তথ্য অধিকার আইনের ৪ নম্বর ধারায় তথ্য অধিকার বিষযে বলা হয়েছে- ‘কর্তৃপক্ষের নিকট হইতে প্রত্যেক নাগরিকের তথ্য লাভের অধিকার থাকিবে এবং কোন নাগরিকের অনুরোধের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাহাকে তথ্য সরবরাহ করিতে বাধ্য থাকিবে’। তথ্য সরবরাহের মাধ্যম সেবা গ্রহীতার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। হার্ডকপি না-কি মেইলে পেতে চায় তা আবেদন ফরমে উল্লেখ করার সুষ্পষ্ট বিধান রয়েছে। আইনটি সম্পর্কে অবহিতকরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করা হলেও দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো অজ্ঞ।
এআই এর মাধ্যমে আমরা নির্ধারিত এবং নির্দেশিত কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়ন করতে পারি। কিন্তু কোন কাজ করা উচিত আর কোনটি উচিত নয় তা অনেকেই জানে না কিংবা জানা থাকলেও মানে না। এআই যেকোন একটি কন্টেন্ট তৈরীতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সে কন্টেন্টটির তথ্য যখন ইনপুট দেওয়া হচ্ছে তা যদি সঠিক না হয়, তবে তা গুজব আকারে মানুষের মাঝে পৌঁছায়। যা মিসাইল বোমার চেয়েও কোন অংশে কম নয়। আর বর্তমান সময়ে আলোচিত ডিপফেক বিষয়টি সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। অনেক ক্ষেত্রে উদ্দ্যেশ্য প্রণোদিতভাবেই এ কাজগুলো হচ্ছে। অথচ একজন তথ্য সেবা গ্রহীতা হিসেবে ডিজিটাল মাধ্যমেই আমরা কোন একটি কন্টেন্ট বা তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি খুব সহজে। সরকারি কোন তথ্য হলে ওয়েবপোর্টালে প্রদত্ত তথ্য কিংবা কর্তৃপক্ষের সাথে যোযোগের মাধ্যমে সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়। অধিকাংশই এ বিষয়ে উদাসীন। ডিজিটাল টুলসের ব্যবহার যতই বাড়ছে, তথ্য সন্ত্রাসের বিষয়টি ততই প্রাঙ্গিক হয়ে উঠছে।
ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা এআই নির্ভর তথ্য প্রাপ্তির বিষয়টি তথ্য অধিকার আইনে সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তাই সময়ের চাহিদায় এ বিষয়টি গুরুত্ব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ এ ডিজিটাল মাধ্যম তথা কন্টেন্ট ভিত্তিক তথ্য নিয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা রয়েছে। এ আইনটির সঠিক ব্যবহার ডিজিটাল যুগে সঠিক তথ্য নিশ্চিতে সহায়ক হতে পারে। যতো আইন থাকুক না কেন একজন নাগরিক হিসেবে আমরা সচেতন কিংবা সম্যক জ্ঞান অর্জন বা প্রয়োগ না করলে ডিজিটাল এ সময়ে গুজব ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আমাদের নানা বিপর্যয় এর জন্য যথেষ্ট।
