পার্বত্য চুক্তির পরও পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র, খুন-গুম ও অশান্তি।


admin প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৩০, ২০২৫, ৫:৪৯ অপরাহ্ন /
পার্বত্য চুক্তির পরও পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র, খুন-গুম ও অশান্তি।

ডেস্ক রিপোর্টঃ

 

১৯৯৭ সালের ২-রা ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাংলাদেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। লক্ষ্য ছিল পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকট এবং সশস্ত্র উত্তেজনা শেষ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। তবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে শান্তি অর্জন সম্পূর্ণভাবে সম্ভব হয়নি।

 

চুক্তির পর থেকে পার্বত্য অঞ্চলে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িতদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও ভিন্ন স্বার্থের লড়াই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১৯৭২ সালে আত্মপ্রকাশ করা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) পাহাড়ে সন্ত্রাস ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভিত্তি গড়েছিল। যদিও ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মাধ্যমে তাদের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পথ সুগম হওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, তথাপি স্বার্থনির্ভর নেতারা চুক্তি বিরোধী কার্যক্রমে লিপ্ত হয়। এর ফলে ১৯৯৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত কনফারেন্সের মাধ্যমে ইউপিডিএফ-এর জন্ম হয়। পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং পুনর্গঠন (জেএসএস মূল ও সংস্কার ২০০৮, ইউপিডিএফ মূল ও গণতান্ত্রিক ২০১৭) সংঘাতের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। ২০২০ সালের পর কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) আত্মপ্রকাশ করে, যা পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে

 

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের তিন প্রধান সশস্ত্র গোষ্ঠী জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফ দীর্ঘদিন ধরে একে অপরের ওপর হামলা চালিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইউপিডিএফ পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্তশাসন দাবি করে, জেএসএস মুখে চুক্তি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন দাবি করে আর বান্দরবান কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) পার্বত্য চট্টগ্রামের ৯টি উপজেলা নিয়ে কুকি রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। এই ৩ সংগঠনের সংঘাতের কারণে প্রায় ১৮ লক্ষাধিক মানুষ প্রতিদিন অস্থিরতায় জীবনযাপন করছে। তাদের মধ্যে যেকোনো মুহূর্তে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী হামলা বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। চুক্তির পরও পার্বত্য অঞ্চলে হাজার হাজার মানুষ খুন, গুম ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

 

সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি তাদের অস্ত্র সংগ্রহের জন্য ভারতের মিজোরাম ও মায়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সহায়তা গ্রহণ করে। জেএসএস-এর “শান্তিবাহিনী” ভারতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় গঠিত হয়েছিল, যা এখনও বহাল। ইউপিডিএফ ও কেএনএফও ভারী অস্ত্র সংগ্রহ ও গেরিলা প্রশিক্ষণে নিযুক্ত। মায়ানমারের আরাকান আর্মি, কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি, কুকি ন্যাশনাল আর্মি এবং চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (CNF)-এর মাধ্যমে তারা ভারী অস্ত্র সংগ্রহ করছে।

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় স্থাপন করা এসব ঘাঁটি নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। উদাহরণস্বরূপ, ইউপিডিএফের প্রধান হেডকোয়ার্টার খাগড়াছড়ি লক্ষ্মীছড়ি, পানছড়ি দীঘিনালা এবং রাঙামাটি বাঘাইছড়ি কাউখালী অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে প্রায় ২৫০০ সশস্ত্র সদস্য অবস্থান করছে। এছাড়া রামগড়, মাটিরাঙা, বাঘাইছড়ি, সাজেক ও থানচি এলাকায় প্রচুর অস্ত্রঘাঁটি রয়েছে। জেএসএস-এর ভারতীয় সীমান্তবর্তী ঘাঁটিতে প্রায় ৪০০ সদস্য এবং রাঙামাটি ও বান্দরবান এলাকায় ৫,২০০ অস্ত্রধারী সদস্যের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে যে এই গোষ্ঠীগুলির ক্ষমতা অপরিসীম। কেএনএফ এর প্রায় ১৫০০ অস্ত্রধারী রয়েছে বলে জানা যায়।

 

জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফ অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে। এদের অস্ত্রভাণ্ডারে রয়েছে একে-৪৭, একে-৫৬, এম-১৬, স্নাইপার রাইফেল, মেশিনগান, হ্যান্ড গ্রেনেড, আইইডি, রকেট লঞ্চার ও অন্যান্য ভারী অস্ত্র। জেএসএস সদস্যরা গাঢ় সবুজ বা বন সবুজ সামরিক পোশাক পরিধান করে, ইউপিডিএফ সেনাবাহিনীর মতো পোশাক ব্যবহার করে। কেএনএফ তাদের সদস্যদের বিশেষ সামরিক পোশাক সরবরাহ করে।

 

ভারত ও মায়ানমারের অবাধ সীমান্ত পারের মাধ্যমে অস্ত্র পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবাহিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ মিজোরাম পুলিশ এক বড় অস্ত্র চালান আটক করে। ২৭ জুন ২০২৪ খাগড়াছড়ি সীমান্ত দিয়ে ভারী অস্ত্র বাংলাদেশে প্রবেশের ঘটনা ধরা পড়ে। এসব অস্ত্র মূলত ইউপিডিএফ ও জেএসএস-এর হাতে পৌঁছছে। র‌্যাবের মতে, ধুধুকছড়া এলাকা ভারত থেকে অস্ত্র প্রবেশের একটি মূল পথ। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি শিথিল হওয়ায় এ প্রবাহ অব্যাহত।

 

নিরাপত্তা বাহিনী সময়কালের বিভিন্ন অভিযানে বিপুল অস্ত্র ও সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে।

 

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩: গুইমারা রিজিয়নে উদ্ধার ১টি একে-৪৭, ১টি এম-১, ১টি একে-২২, ৪টি মর্টার, ১টি পিস্তল, আইইডি সরঞ্জামাদি। ৭ মে ২০২৪: কেওক্রাডং পাহাড়ে কেএনএফ সদস্য নিহত, ৩টি একে-২২, ১টি শটগান, বিস্ফোরক সরঞ্জামাদি, ড্রোন উদ্ধার।

১৪ নভেম্বর ২০২৪: মুনলাই পাড়ায় এসএমজি, ২টি গাঁদা বন্দুক, আইইডি উপকরণ উদ্ধার। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪: রুমা উপজেলার ধোপানী ছড়ায় ২টি অটোমেটিক কারবাইন, ১টি সেমি অটোমেটিক অ্যাসল্ট রাইফেল, ৩টি এসবিবিএল, সোলার সিস্টেম, ড্রোন উদ্ধার। ২১ ডিসেম্বর ২০১৮: রাঙামাটিতে মেশিনগানসহ তিন অস্ত্র ব্যবসায়ী আটক।

 

এই উদ্ধার অভিযানগুলির পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, পার্বত্য অঞ্চলে অস্ত্র ভাণ্ডার বিপুল হলেও উদ্ধারকৃত অস্ত্র সামান্য। ফলে সন্ত্রাসী কার্যক্রম সীমিত করা সম্ভব হয়নি।

 

গত ১১ জুন ২০২২ ভারত থেকে ইউপিডিএফ-এর ৩ কোটি টাকার অস্ত্র চালান পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করায় সংঘর্ষ শুরু হয়। জেএসএস-এর কমান্ডার অর্জুন ত্রিপুরার নেতৃত্বে রাঙামাটি বাঘাইছড়ি-ভারত সীমান্তে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়। সংঘর্ষে ইউপিডিএফ-এর ২ জন নিহত ও ৬ জন আহত হয়। ১২ ও ১৮ জুলাই পুনরায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

 

সূত্র অনুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চলের ১৭৮ কিলোমিটার সীমান্ত অধিকাংশই জেএসএস-এর দখলে। ইউপিডিএফ বাঘাইছড়ি সীমান্তের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ভারত থেকে অস্ত্র আনা প্রধান পথ বাঘাইছড়ি সীমান্ত। ইউপিডিএফ অস্ত্র চালানের পথ আটকাতে জেএসএস দীঘিনালা ও পানছড়ির কিছু এলাকা দখল করে।

 

সশস্ত্র গোষ্ঠী পাহাড়িদের অধিকারের দোহাই দিয়ে চাঁদাবাজি করে। আদায়কৃত অর্থ দিয়ে শীর্ষ নেতারা দেশ-বিদেশে বিলাসিতায় জীবনযাপন করে, সন্তানদের বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়। প্রকৃতপক্ষে, পার্বত্য অঞ্চলকে নরকায় পরিণত করা হয়েছে অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে।

 

সাত রাজ্যের ভারতীয় রাজ্য, যেমন মিজোরাম, ত্রিপুরা ও অরুণাচল প্রদেশ থেকে অস্ত্র সরবরাহ হচ্ছে। মায়ানমার থেকে মিজোরামের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলে অস্ত্র প্রবাহিত হচ্ছে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া না থাকার কারণে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অবাধে চলাচল করছে।

 

পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থিতিশীলতা ফেরাতে কেবল অস্ত্র উদ্ধার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন: সুশাসন ও কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প বৃদ্ধি, সীমান্তে নিরাপত্তা বৃদ্ধি ও অস্ত্র চোরাচালান ঠেকানো। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রতিবেশী দেশগুলোর সহযোগিতা নিয়ে অবৈধ অস্ত্র ও সশস্ত্র কার্যক্রম বন্ধ করা। রাজনৈতিক সমঝোতা পার্বত্য চুক্তির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ সমাধান। অর্থ ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ-সশস্ত্র গোষ্ঠীর অর্থায়ন বন্ধ করতে স্থানীয় সহায়তা ও নজরদারি বৃদ্ধি।

 

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির স্বাক্ষর সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র গোষ্ঠীর দাপট অব্যাহত রয়েছে। জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফের অস্ত্রভাণ্ডার, সীমান্তে অবাধ চলাচল, আন্তর্জাতিক অস্ত্র সরবরাহ এবং অভ্যন্তরীণ সংঘাত পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনকে ভয়াবহভাবে প্রভাবিত করছে। উদ্ধার অভিযান ও আইন প্রয়োগ কিছু প্রভাব ফেললেও, কার্যকর ও সুসংগঠিত পদক্ষেপের অভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। শান্তি ও নিরাপত্তা পুনঃস্থাপনের জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্র পাচার ও সশস্ত্র সংঘাত নিয়ন্ত্রণে না এলে, শান্তি ও নিরাপত্তা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করা দুষ্কর হবে।