
রামগড় অফিস:
ক্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে নির্বাচনি প্রচারণা। গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী প্রেক্ষাপটে এবারের সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। ভোটের মাঠের লড়াইয়ে প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন দুটি নির্বাচনি ঐক্য ও জোট। তবে খাগড়াছড়ি ২৯৮ নং আসনের সমীকরণ কিছুটা ভিন্ন। পার্বত্য চট্টগ্রামের এই জেলায় নতুন সমীকরণের দিকে হাটছে পাহাড়ি-বাঙালি ভোটার।
খাগড়াছড়ি আসন নয়টি উপজেলা ও তিন পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ ৫৪ হাজার ১১৯ জন, যার মধ্যে দুই লাখ ৮০ হাজার ২০৬ জন পুরুষ, দুই লাখ ৭৩ হাজার ৯০৯ জন নারী ও চারজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে। পার্বত্য অঞ্চল হওয়ায় খাগড়াছড়ি আসনটিতে পাহাড়ি-বাঙালিসহ ১৩টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বসবাস করে আসছে। তাদের ঘিরেই ভোটের হিসাব কষছেন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম খাগড়াছড়ি আসনটি জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ভোটের মাঠে সরব উপস্থিতি আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সমর্থন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। পাহাড়ে বসবাসরত সকল উপজাতি গোষ্ঠীরদ্বয়ের উপর চরম আধিপত্য, অস্ত্র ও পেশী শক্তির প্রভাব আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন যেকোনো প্রার্থীকে জয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। বিশেষ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও পার্বত্য জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) অন্যতম। এছাড়াও আরো দুটি সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) জেএসএস (সংস্কার) প্রভাবও বিদ্যমান। এছাড়া আওয়ামী লীগেরও দাপট রয়েছে। ভোটের মাঠে বিগত নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ যথেষ্ট প্রভাব দেখিয়েছে।
এবারে আসনটিতে ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনের হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপি সমর্থিত ধানের শীষের প্রার্থী সাবেক দুই বারের এমপি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান এবং জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ ভুইয়া, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী এডভোকেট মো. এয়াকুব আলী, স্বতন্ত্র প্রার্থী ঘোড়া প্রতীকের ধর্ম জ্যোতি চাকমা, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদ্য বহিষ্কৃত সদস্য ফুটবল প্রতীকের সমীরণ দেওয়ান। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে হাতপাখা প্রতীকে মো. কাউছার, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে মিথিলা রোয়াজা, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) থেকে রকেট প্রতীকে উশ্যেপ্রু মারমা, গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) থেকে ট্রাক প্রতীকে দীনময় রোয়াজা, স্বতন্ত্র কলস প্রতীকে জিরুনা ত্রিপুরা, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে আপেল প্রতীকে মো. নুর ইসলাম, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ থেকে হারিকেন প্রতীকে মো. মোস্তফা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
উৎসবমূখর পরিবেশে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রার্থীরা। বিগত নির্বাচনে পাহাড়ীদের বেশিরভাগ ভোটার একক প্রার্থীর পক্ষে থাকলেও এবার ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থীর শোডাউনে ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। জয় পরাজয়ে তাদের ভুমিকা অন্যবারের চেয়ে বেশি থাকবে। প্রচারণার মাঠ বিশ্লেষণে দেখা যায় উপজাতীয় ভোটারদের মধ্যে মারমা সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ ভোট বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে গেলেও ত্রিপুরা ও চাকমা সম্প্রদায়ের ভোট ভাগ হয়ে যাবে। এদের বড় অংশের ভোট স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যোতি চাকমা ও সমিরন দেওয়ানের প্রতিকে পড়বে। মূলত উপজাতীয় সম্প্রদায়ের ভোট ধানের শীষ, ঘোড়া ও ফুটবল প্রতিকে পড়ার সম্ভাবনা আছে। এছাড়া জামায়াত ইসলামির দাঁড়িপাল্লা প্রতিকের পথসভা ও মিছিলেও পাহাড়ী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল দেখার মত।
ভোটের লড়াইয়ে পাহাড়ী-বাঙ্গালি ভোটারদের কদর বাড়ার সাথে সাথে হিসাব নিকাশে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন প্রার্থীরা। বাঙালি প্রার্থীরা যেমন পাহাড়ী ভোটারদের কাছে আনার জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন ঠিক পাহাড়ী প্রার্থীরাও বাঙালি ভোটারদের নজরে আনতে চাচ্ছেন। সমিরন দেওয়ানের ফুটবল প্রতিক, মিথিলা রোয়াযার লাঙ্গল প্রতিকের জন্য অনেক বাঙালি সমর্থককে ভোট চাইতেও দেখা যাচ্ছে। কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে হিসাবের চেয়ে এখন বড় প্রশ্ন-শেষ পর্যন্ত ভোটের ভাগাভাগি কার পক্ষে যাবে। নির্বাচন আগ পর্যন্ত সবকিছু ঠিক থাকলে পাহাড়ী- বাঙ্গালি ভোটে ভাগ বসাবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা।
আপনার মতামত লিখুন :