সাধারণ

পশ্চিমাদের দুমুখো নীতি, ইউক্রেনে সরব ফিলিস্তিনে নীরব

ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে যারা দূরে আছে, তাদের অনেকের কাছেই লাপিডের বক্তব্য কোনো তাৎপর্য বহন করে না। কিন্তু আমরা যারা ফিলিস্তিনবাসী ইসরায়েলের দখলদারি ও জাতিবিদ্বেষের শিকার, তাদের কাছে ইউক্রেনের জনগণের প্রতি লিপিডের এই সমর্থনসূচক বক্তব্য সজোরে চপেটাঘাত ছাড়া আর কিছু নয়। নির্লজ্জ, ভণ্ডামির এক জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত এটি। রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দা জানানোর ক্ষেত্রে শুধু ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভণ্ডামি করছেন না, ইসরায়েলের লোকজনও তা করছে। ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর তাদের যে নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড, সেটা আড়ালে রেখেই তারা ইউক্রেনের জনগণের প্রতিরোধ সংগ্রামে সমর্থন দিচ্ছে।

ইউক্রেনের সমর্থনে তেল-আবিবে হাজার হাজার ইসরায়েলি নাগরিক বিক্ষোভ করেছে। তারা ইউক্রেনের পতাকা হাতে নিয়ে মিছিল করেছে। দাবি তুলেছে, ‘ইউক্রেনকে মুক্ত করো’। ফিলিস্তিনিরা বাক্‌রুদ্ধ চোখে সেটা দেখেছে। ‘ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো’, এমন দাবি নিয়ে কোনো ইসরায়েলিকে কোনো দিন রাস্তায় দেখা যায় না। তাদের জাতিবিদ্বেষী রাষ্ট্রে ফিলিস্তিনিদের সম-অধিকারের কথাও তারা কোনো দিন বলে না। ফিলিস্তিনিরা যখন তাঁদের পতাকা নিয়ে রাস্তায় নামেন, ‘ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো’ বলে স্লোগান দেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশি বর্বরতা, এমনকি আরও খারাপ কিছুর মুখোমুখি হতে হয় তাদের।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ফিলিস্তিনিরা শুধু ইসরায়েলের কর্মকর্তা ও নাগরিকদের ভণ্ডামিপূর্ণ আচরণ দেখে নতুন করে কষ্ট পাচ্ছে না। বিশ্বসম্প্রদায়ের বড় একটা অংশের ভণ্ডামিও তাদের দেখতে হচ্ছে। ইউক্রেনের সীমানায় রাশিয়ার সেনাদের প্রবেশ এবং ইউক্রেন কখনো সত্যিকারের দেশ নয়, সেটা সব সময়ই রাশিয়ার অংশ, এমন দাবি করার পর সব পশ্চিমা নেতা, সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকেরা এর বিরুদ্ধে অত্যন্ত আবেগপূর্ণ কথাবার্তা বলতে শুরু করেছেন। দখলদারি কতটা অবৈধ, এর শিকার মানুষের সশস্ত্র সংগ্রামের কতটা অধিকার, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বায়ত্তশাসন কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এসব যুক্তি তাঁরা অবতারণা করছেন। কিন্তু ফিলিস্তিনি জনগণ এবং তাদের কয়েক দশকের দীর্ঘ স্বাধীনতাসংগ্রামের সমর্থনে তাঁদের এসব যুক্তি ও ধারণা কখনোই দেখা যায় না।

বছরের পর বছর ধরে বিশ্বসম্প্রদায় আমাদের প্রতি ভণ্ডামি করে আসছে। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরুর পর আমরা ফিলিস্তিনিরা নতুন করে আবার সেই ভণ্ডামির মুখোমুখি হলাম। আমরা জানতে পারলাম, আমরা আমাদের জন্মভূমিতে যেসব ভয়ানক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই, তা রুখে দেওয়ার মতো আন্তর্জাতিক আইন আছে। শুধু কাগজে-কলমের আইন নয়, সেটা কার্যকরও হয়। আমরা শিখলাম, যখন কেউ অন্য কোনো দেশে আগ্রাসন চালায়, তখন অন্য দেশগুলোর কিছু করার সামর্থ্য ও ইচ্ছা দুই-ই থাকে। আমরা শিখলাম, আগ্রাসনকারীর বিরুদ্ধে খুব দ্রুত নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও কার্যকর করা যায়। আমরা শিখলাম, মানুষ, যারা হতাহত হয় তারা শুধু সংখ্যা নয়, তারা জীবন্ত সত্তা। রাজনীতিবিদ, পণ্ডিত, বিশ্লেষক এবং আমাদের ভূখণ্ডে আগ্রাসনকারী ও আমাদের বাড়িঘর দখলদারিদের কাছ থেকে আমরা শিখলাম, দখলদারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম ‘সন্ত্রাসবাদ’ নয়, সেটা ন্যায়সংগত অধিকার।

গত কয়েক দিন সংবাদপত্র, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভরে উঠছে ইউক্রেনের জনগণের ‘বীরত্ব ও প্রতিরোধ’-এর গল্পে। রাশিয়ার ট্যাংকবহরের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে কীভাবে সেনারা ব্রিজ উড়িয়ে দিচ্ছে, হাতের কাছে যা কিছু পাচ্ছে, তা-ই দিয়ে কীভাবে বেসামরিক নাগরিকেরা সশস্ত্র যানবাহনে হামলা চালাচ্ছে, সাধারণ মানুষ কীভাবে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এবং পরিখা খুঁড়ছে—এসব বীরত্বপূর্ণ কাহিনি আমরা জানতে পারছি। ইউক্রেনের বদলে ফিলিস্তিনের কোথাও যদি এমন একটি ঘটনা ঘটত, তাহলে সেটা আর বীরত্বের কাহিনি থাকত না। স্রেফ সেটাকে সন্ত্রাস বলে দায়ী করা হতো।

রাশিয়ার সৈন্যদের আক্রমণ করার জন্য ইউক্রেনের মানুষ যে মলোটোভ বোমা বানাচ্ছে, সেটাও খুব ইতিবাচকভাবে তুলে ধরছে সংবাদমাধ্যম। ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। তাদের সুরক্ষা দেয় ইসরায়েলের নিরাপত্তাবাহিনী। ফিলিস্তিনিরা যদি এ সময় দখলদারদের ঠেকাতে একই কাজ করে, তাহলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কী ভূমিকা পালন করবে? ইউক্রেনের মানুষ রাশিয়ার দখলদারির বিরুদ্ধে এটা করলে বলা হবে হবে বীরত্ব। আর ফিলিস্তিনিরা সেটা করলে হবে সন্ত্রাস। এই বাস্তবতা শুধু ফিলিস্তিনের একার নয়। আমি নিশ্চিত যে আফগানিস্তান, ইয়েমেন, ইথিওপিয়া, ইরাক, সোমালিয়া কিংবা কাশ্মীর—যেখানেই এ ধরনের ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী সহিংসতার অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেখানকার জনগণেরও আমাদের মতো অনুভূতি হচ্ছে।

গত সপ্তাহে আমি অনেকের কাছে শুনেছি, এখন ফিলিস্তিন, ইয়েমেন, লিবিয়া কিংবা ইরাক নিয়ে কথা বলার সময় নয়। তাঁরা বলছেন, এখন ভিন্ন কোনো প্রশ্ন তোলা মানে রাশিয়ার হাত শক্তিশালী করা। তাঁদের উদ্দেশে আমি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে চায়, বিশ্বব্যাপী সামরিক আগ্রাসন, দখলদারি ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলার এখনই উপযুক্ত সময়। এখন পশ্চিমের সব শক্তিশালী রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং এমনকি ইসরায়েলের শাসকেরা প্রকাশ্যে স্বীকার করছেন, আগ্রাসন ও দখলদারি খারাপ। প্রতিরোধের অধিকার শুধু বৈধ নয়, সম্মানজনকও।

বিশ্বের যে প্রান্তেই হোক না কেন, যুদ্ধের বলি সব মানুষকে সমর্থন দিতে হবে। আমাদের অবশ্যই ফিলিস্তিন, ইয়েমেন, লিবিয়া, আফগানিস্তান ও কাশ্মীরের বিষয়ে কথা বলা শুরু করতে হবে। ফিলিস্তিনিরা স্বাধীনতাসংগ্রামী সব মানুষের সংগ্রামকে সমর্থন করে যাবে। আমরা তাদের সঙ্গে সংহতির বন্ধনে আবদ্ধ থাকি। কারণ, আমাদের সবার রয়েছে একই অভিজ্ঞতা। ইউক্রেনের জনগণের সংগ্রামে সমর্থন করে যাব, কেননা আগ্রাসনকারীরা তাদের জমি ও ভবিষ্যৎ চুরি করতে এসেছে। আমরা সেখানে আমাদেরও দেখতে পাচ্ছি। *প্রথম আলো*

আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ মনোজ দে

Related Articles

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Back to top button